আজাদ শীতের ছুটিতে সিলেটে চা বাগান দেখতে গেল। সেখানে গিয়ে জানতে পারল যে, বাংলাদেশের উৎপাদিত চা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। কিন্তু চা শিল্পের কিছু সমস্যার কারণে উন্নতি করতে পারছে না। আজাদ সেই সমস্যাগুলো উপলব্ধি করে।
অল্প শিক্ষিত ও প্রশিক্ষণবিহীন সদস্যরা জীবনধারণের তাগিদে পরিবারের স্বল্প মূলধন ও সহজলভ্য যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ঘরে বসে বিভিন্ন দ্রব্য উৎপাদন করে তা-ই কুটির শিল্প।
কোনো একটি দেশ যে সব দ্রব্য আমদানি করে থাকে, তা যদি আমদানি না করে দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদন করা হয় তাকে আমদানি বিকল্পন শিল্প বলে। অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা, মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ইত্যাদি কারণে আমদানি বিকল্পন শিল্প স্থাপন করা হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বাংলাদেশ সাধারণত গাড়ি আমদানি করে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশ যদি আমদানি না করে দেশের অভ্যন্তরেই গাড়ি তৈরির কলাকৌশল ব্যবহার করে গাড়ি তৈরি করতে পারে তাহলে তা আমদানি বিকল্পন শিল্প বলে গণ্য হবে।
উদ্দীপকে উল্লেখিত শিল্পটি হলো চা শিল্প। নিচে চা শিল্পের সমস্যাগুলো ব্যাখ্যা করা হলো-
বাংলাদেশের চা শিল্প প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। কোনো বছর বৃষ্টি কম হলে চা উৎপাদন কম হয়, কারণ চা উৎপাদনের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত প্রয়োজন। পাহাড়ি অঞ্চলে চা বাগান হওয়ায় মূল ভূখণ্ডের সাথে চা বাগানে যাওয়ার ভালো সড়ক নেই, এমনকি টেলিফোন লাইন, মোবাইল নেটওয়ার্ক বা বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও অনেক স্থানে অপ্রতুল। চা শিল্পে দক্ষ শ্রমিকের খুব অভাব, যেখানে ঐতিহাসিক কিছু অবাঙালি পরিবার চা উৎপাদনে নিয়োজিত। তারা শুধু দেখে দেখে কাজ শিখেছে। চায়ের বিকল্প হিসেবে কফির উৎপাদন ও ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশের চায়ের চাহিদা বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। পুরাতন পদ্ধতিতে চা চাষের ফলে বিশ্বমানের চা উৎপাদনে বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে আছে। চা বাগানগুলোতে প্রায়ই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে, যার ফলে নিরাপত্তার অভাবে অনেক দক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারী বাগান এলাকায় বসবাস করতে চান না। ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, চীন এদের চা অপেক্ষাকৃত উন্নত হওয়ায় রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশ এদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ে। চা বাগান তৈরি, পাতা প্রক্রিয়াকরণ ও বিপণনে বড় মূলধন প্রয়োজন, যা সহজে ফেরত আসে না। তাই এ ক্ষেত্রে নতুন উদ্যোক্তা, নতুন মূলধন দেখা যায় না। উল্লিখিত এসব সমস্যা বাংলাদেশের চা শিল্পে বিদ্যমান।
চা শিল্পের সমস্যা সমাধানে বিভিন্নমুখী উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। নিচে উক্ত সমস্যার সমাধান সম্পর্কে আমার মতামত উপস্থাপন করা হলো-
চা উৎপাদনে আধুনিক উৎপাদন পদ্ধতি প্রয়োগ করা একান্ত প্রয়োজন। পুরনো পদ্ধতির পরিবর্তে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে তাল মিলিয়ে উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োগ করে একরপ্রতি উৎপাদন বাড়াতে হবে। অনাবৃষ্টি ও খরার সময় চা বাগানে পর্যাপ্ত সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। অদক্ষ, অশিক্ষিত শ্রমিক-কর্মচারীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে বাগানের পরিচর্যা ও পাতা সংগ্রহে দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে, উৎপাদন বাড়বে। চা বাগান এলাকার পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। চা বাগানের সাথে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ ও পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। বিভিন্ন নেটওয়ার্ক স্থাপন ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়মিত করতে হবে। বিদেশে চা রপ্তানি বাড়ানোর জন্য নতুন নতুন বাজার সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে। ব্যাপক প্রচারণা, পণ্যের গুণগত মান বৃদ্ধি, প্রদর্শনী মেলায় অংশগ্রহণ রপ্তানি বাজার বৃদ্ধির সহায়ক। চা বাগানগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত ঋণ সুবিধাসহ সার ও কীটনাশকের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে অবশ্যই চায়ের গুণগত মান বাড়াতে হবে। চা শিল্পের উন্নয়নে নিবিড় গবেষণা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা জোরদার করা একান্ত প্রয়োজন। গুণগত মান বজায় রাখার জন্য চায়ের উত্তম গুদামজাতকরণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্যাকেটিং প্রয়োজন। চা বাগান, প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, চা রপ্তানির সাথে জড়িত বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর দুর্নীতি বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। উল্লিখিত কার্যক্রমের মাধ্যমে চা শিল্পের সমস্যাগুলো দূর করা সম্ভম্ব বলে আমি মনে করি।
বাংলাদেশে বৃহৎ ও মাঝারি শিল্প এবং কুটির শিল্প এই দুই চরম বিপরীতধর্মী প্রতিষ্ঠানের মাঝখানে রয়েছে ক্ষুদ্র শিল্প। ক্ষুদ্র শিল্প বলতে সেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বোঝাবে যেসব প্রতিষ্ঠানে জমি এবং কারখানাভবন ব্যতিরেকে স্থায়ী সম্পদের মূল্য প্রতিস্থাপন ব্যয়সহ ৫০ লাখ টাকা থেকে ১০ কোটি টাকা কিংবা যেসব শিল্প প্রতিষ্ঠানে ২৫-৯৯ জন শ্রমিক কাজ করে। ক্ষুদ্র শিল্পের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- সাবান শিল্প, দিয়াশলাই শিল্প, কাঠশিল্প, হোসিয়ারি শিল্প, লবণ শিল্প ইত্যাদি।
উদ্দীপকে উল্লিখিত কার্যক্রমটি কুটির শিল্পের অন্তর্গত। নিচে তা ব্যাখ্যা করা হলো-
অল্পশিক্ষিত ও প্রশিক্ষণবিহীন সদস্যরা জীবনধারনের তাগিদে পরিবারের স্বল্প মূলধন ও সহজলভ্য যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ঘরে বসে বিভিন্ন দ্রব্য উৎপাদন করলে তাকে কুটির শিল্প বলা হয়। বাংলাদেশের শিল্প আইন অনুসারে যে শিল্পের মূলধন অনধিক ৫ লাখ টাকা (শিল্পনীতি ২০১০) এবং অনধিক ১০ জন লোক কাজ করে তাকে কুটির শিল্প বলে। অর্থাৎ স্বল্প মূলধন, হালকা যন্ত্রপাতি ও দেশীয় কাঁচামাল দ্বারা পরিবারের সদস্যদের সহায়তায় পারিবারিক পরিবেশে কুটির শিল্পের কাজ করা হয়। উল্লেখযোগ্য কুটির শিল্পের মধ্যে আছে বাঁশ ও বেতের কাজ, হাঁড়ি-পাতিল, টব, মৃৎশিল্প, নকশি কাঁথা, দা, কুঠার, লৌহজাত শিল্প, বিড়ি, মোমবাতি ইত্যাদি। কুটির শিল্পে সাধারণত নিজেদের উদ্ভাবিত হস্তচালিত যন্ত্র দ্বারা উৎপাদন পরিচালনা করা হয়। সাধারণত জীবননির্বাহী ধারণায় শুধু পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর জন্য এ শিল্প পরিচালিত হয়। পরিবারের সদস্যরা বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করে এবং মালিকানা পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। উদ্দীপকে তুষারের পরিবারের সদস্যরাও কুটির শিল্পে কাজ করে। তারা বাঁশ, বেত ও নকশি কাঁথার কাজ করে, যা কুটির শিল্পের অন্তর্গত। তারা এসব পণ্য বাজারে বিক্রি করে অর্থ আয় করছে, এতে তাদের সচ্ছলতা বাড়ছে।